ওয়ার্ল্ড ডেস্ক, ১৯ মার্চ ২০২৫, ২১:৩৯:০৯: চিকিৎসা ভিসা না পেয়ে চীন ও থাইল্যান্ড যাচ্ছেন বহু বাংলাদেশী। ঢাকায় মেডিকেল পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করছে শি জিংপিং এর দেশ। হাসপাতাল ছাড়াও সৌর শক্তি এবং অন্যান্য পরিকাঠামো বাংলাদেশে তৈরি করতে সক্রিয় হচ্ছে চীন। বাংলাদেশ ও চীন আরো কাছাকাছি আসছে বুঝেও ভারত কেন ভিসা স্বাভাবিক করছে না, তা বুঝতে পারছেন না বহু কূটনৈতিক।
ভিসা প্রদান আগের মত স্বাভাবিক না করায় চীনের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সূত্রের দাবী, ভারতের কাছে বারংবার বাংলাদেশ ভিসা প্রদান আগের মত স্বাভাবিক করতে চেয়ে একাধিক বার আবেদন করলেও কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির মধ্যে কর্মী সংকটের কারণে স্বাভাবিক পরিমাণে মেডিকেল ভিসা প্রদান পুনরায় শুরু করা সম্ভব নয় তা জানিয়েছে বাংলাদেশকে। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে চীন। ভারত কেন বাংলাদেশী পর্যটকদের জন্য দরজা বন্ধ করে নিজেদের আর্থিক ক্ষতি করছে এই উত্তর নেই কারও কাছে।
২০২৪ সালে ভারতের ভিসা না পেয়ে বহু বাংলাদেশি চীনে গিয়েছিলেন। সেখানে সাশ্রয়ী মূল্যের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং বাংলাভাষী হাসপাতালের কর্মীদের সন্ধান করছিল। বাংলাদেশের বেশ কিছু সূত্রের দাবী, "যখন শূন্যতা তৈরি হয়, তখন অন্যরা এসে সেই স্থান পূরণ করবে।" কয়েকজন কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেছেন, "কিছু লোক থাইল্যান্ড এবং চীন যাচ্ছে।"
আগস্ট থেকে, ভারত প্রতি কর্মদিবসে ১,০০০ এরও কম মেডিকেল ভিসা দিয়েছে। আগে এই সংখ্যা ছিল ৫,০০০ থেকে ৭,০০০। নোবেল শান্তি বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের দীর্ঘমেয়াদী মিত্র শেখ হাসিনার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর সম্পর্ক পতনের সাথে সাথে ভিসা সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
আগস্টে প্রাণঘাতী বিক্ষোভের পর ঢাকা থেকে পালিয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লীতে আশ্রয় নেন এবং বিচারের জন্য তাঁকে দেশে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ অনুরোধ করলেও ভারত সাড়া দেয়নি। উভয় দেশের সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে ভারত বাংলাদেশিদের ২০ লক্ষেরও বেশি ভিসা দিয়েছে, যার বেশিরভাগই চিকিৎসার কারণে। চীন বাংলাদেশের এই বাজার ধরতে উদ্যোগ নিয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, "চিকিৎসা পর্যটন বাজারের সম্ভাবনা অন্বেষণ" করার জন্য, এই মাসেই বাংলাদেশিদের একটি দল চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ পরিদর্শন করেছে।"
ওয়েন গত সপ্তাহে আরও বলেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তাদের কমপক্ষে ১৪টি কোম্পানি বাংলাদেশে ২৩০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে, যা এই সময়ের মধ্যে যেকোনও দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।"
বাংলাদেশের কার্যত প্রধানমন্ত্রী ইউনূস রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সাথে দেখা করার জন্য এই মাসে চীন সফর করবেন। ২০২০ সালে হিমালয় সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীনের সাথে ভারত ধীরে ধীরে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করছে। বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, চীন ঢাকায় একটি ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল খোলার কথা বিবেচনা করছে এবং সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা বাংলাদেশিদের জন্য প্রবেশাধিকার সহজ করেছে।
চীন বাংলাদেশের সাথে একসাথে কাজ করতে ইচ্ছুক, পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা আরও গভীর ও অন্বেষণ করতে চাইছে।
চীনের মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, "চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা কোনও তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, এবং এটি তৃতীয় পক্ষের কারণ দ্বারা প্রভাবিতও নয়।"
বাংলাদেশের বেশ কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ভারতের বিলম্বিত ভিসা প্রক্রিয়া কেবল বাংলাদেশ সরকারকেই নয়, বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকেও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। যা ভারতকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ঢাকার সুবিধা থেকে দূরে রাখতে পারে, কারণ হাসিনার দলের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কম।
কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ভারত বারবার ভিসা সমস্যার জন্য ঢাকায় তার দূতাবাসে কর্মীদের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে এবং ভারতীয় সরকারি সূত্র আরও জানিয়েছে যে তারা কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য জনমতের বিরুদ্ধে যাওয়ার পর, নয়াদিল্লি আগস্টে বাংলাদেশে তার মিশন থেকে অনেক কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে। যখন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বিক্ষোভকারীরা ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।
ভারত সরকারের সূত্র জানিয়েছে যে, তারা চায় যে চিকিৎসাগত সমস্যায় ভুগছেন এমন বাংলাদেশিরা ভারতে চিকিৎসার সুযোগ পান। "বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা" এলে প্রতিবেশী দেশটিতে মিশনগুলিতে কর্মীরা যোগ দেবে।
তাঁদের মধ্যে একজন আরও বলেন যে, "বাংলাদেশের কঠিন পরিস্থিতি থেকে পালানোর চেষ্টা" করাদের নিয়ে কিছু লোক অপপ্রচার করছে সেকারণে মেডিকেল ভিসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে যে, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কোনও রাজনীতিকের সাথে যোগাযোগ করেনি, তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি বেইজিংয়ের আমন্ত্রণে চীনে গিয়েছিল।
চীনের শীর্ষ সৌরশক্তি কোম্পানি লংগি গ্রিন এনার্জি বাংলাদেশে একটি অফিস স্থাপন এবং উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করতে সম্মত হওয়ার পর বাংলাদেশ চীনের জন্য তার বাজার আরও উন্মুক্ত করতে প্রস্তুত।
ওয়েন "পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়" নিয়ে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার সাথেও দেখা করেছেন, তবে তিনি আর কোনও বিস্তারিত তথ্য দেননি।
যদিও সূত্রের দাবি, ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে প্রথম বৈঠক আগামী মাসে থাইল্যান্ডে একটি সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একজন ভারতীয় বিশ্লেষক বলেছেন, এ ঘটনায় চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে চীন অন্যতম বৃহৎ খেলোয়াড় হয়ে উঠছে।" দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক হ্যাপিমন জ্যাকব বলেন, "দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সাথে, ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রাধান্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।"
No comments:
Post a Comment